আপনি কি নতুন smartphone কেনার কথা ভাবছেন? তবে সাবধান হয়েজন,নামী কোম্পানিগুলো কীভাবে আপনাকে দিনের আলোয় ঠকাচ্ছে দেখুন
"স্মার্টফোন কোম্পানিগুলো এখন ফিচারের বদলে আপনাকে দিচ্ছে শুধু চটকদার বিজ্ঞাপন। হেডফোন জ্যাক থেকে চার্জার উধাও হওয়া"
Smartphone Scam: আজকালকার দিনে আমাদের জীবন যেন স্মার্টফোন ছাড়া অচল। প্রতি মাসেই বাজারে আসছে নিত্যনতুন সব মডেল, চোখ ধাঁধানো লুক আর দামী সব ফিচারের প্রতিশ্রুতি নিয়ে। আমরাও ভাবি, আগের ফোনটা তো পুরনো হয়ে গেছে, এবার নতুন একটা নেওয়া যাক। কিন্তু একটু ঠান্ডা মাথায় ভেবে দেখেছেন কি, এই যে হাজার হাজার টাকা দিয়ে আপনি নতুন ফোনটা কিনছেন, আদতে তাতে নতুন কিছু পাচ্ছেন তো? নাকি আপনাকে সেই পুরনো জিনিসটাই নতুন মোড়কে গছিয়ে দেওয়া হচ্ছে? বর্তমান সময়ে স্মার্টফোন কোম্পানিগুলোর ব্যবসার ধরন নিয়ে অনেক বড় বড় প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। অনেক বিশেষজ্ঞ এবং প্রযুক্তি বিশ্লেষকরা বলছেন, কোম্পানিগুলো এখন মানুষকে প্রযুক্তি দেওয়ার বদলে বড় বড় মিথ্যে স্বপ্ন দেখাচ্ছে। সাধারণ গ্রাহক হিসেবে আমরা হয়তো অনেক সময় এই সূক্ষ্ম কারসাজিগুলো ধরতেই পারি না। কিন্তু স্মার্টফোন ব্র্যান্ডগুলোর অন্দরমহলের সত্যিটা জানলে আপনিও অবাক হতে বাধ্য হবেন।
স্মার্টফোন কোম্পানিগুলোর সবচেয়ে বড় চাল হলো ফিচারের অভাবকে সুযোগ হিসেবে দেখানো। এক সময় আমরা দেখেছি স্মার্টফোনের বক্সে চার্জার থাকত, ইয়ারফোন থাকত, এমনকি ব্যাটারিও খুলে বদলানো যেত। কিন্তু এখন সেই দিন শেষ। বর্তমানে কোম্পানিগুলো পরিবেশ বাঁচানোর অজুহাত দিয়ে বক্স থেকে চার্জার সরিয়ে দিচ্ছে। তারা বলছে, এতে কার্বন নিঃসরণ কমছে। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হলো, সেই একই কোম্পানি আবার আলাদা করে চার্জার বিক্রি করছে। যদি আপনি আলাদাভাবে চার্জার কেনেন, তবে তো আবার সেই প্যাকেজিং এবং ডেলিভারির জন্য আলাদা পরিবহনের প্রয়োজন হচ্ছে। তাহলে পরিবেশের লাভটা কোথায় হলো? আসলে এর মূল উদ্দেশ্য হলো গ্রাহকের কাছ থেকে বাড়তি টাকা আদায় করা। ঠিক একইভাবে হেডফোন জ্যাক এবং মেমোরি কার্ড স্লট সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। এতে করে গ্রাহককে বাধ্য হয়ে দামী ব্লুটুথ হেডফোন কিনতে হচ্ছে এবং বেশি স্টোরেজের জন্য ফোনের বেশি দামী ভেরিয়েন্ট বেছে নিতে হচ্ছে। যা সরাসরি কোম্পানির পকেট ভারী করছে।
আমাদের দেশে স্মার্টফোন কেনার সময় আমরা বাজেট নিয়ে খুব সচেতন থাকি। কিন্তু ব্র্যান্ডগুলো আমাদের এই মানসিকতা নিয়েও খেলছে। ধরুন, আপনি 10 হাজার টাকার মধ্যে একটা ফোন খুঁজছেন। আপনি দোকানে গিয়ে দেখবেন সেই কোম্পানিটিই 10 থেকে 20 হাজারের মধ্যে অন্তত পাঁচ-ছয়টি মডেল বের করে রেখেছে। প্রতি 2 হাজার টাকার ব্যবধানে তারা এমন কিছু ছোট ছোট ফিচার বদলে দেয়, যাতে গ্রাহক বিভ্রান্ত হয়ে পড়েন। অনেক সময় দেখা যায়, 8 জিবি র্যাম আর 12 জিবি র্যামের ফোনের মধ্যে পারফরম্যান্সের খুব একটা তফাৎ নেই, কিন্তু দামের পার্থক্য কয়েক হাজার টাকা। কোম্পানিগুলো বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে এমন এক 'ফোমো' বা পিছিয়ে পড়ার ভয় তৈরি করে যে, মানুষ ভাবে একটু বেশি টাকা দিয়ে উপরের মডেলটা না কিনলে হয়তো সে পিছিয়ে পড়বে। এভাবেই 10 হাজার টাকার বাজেট নিয়ে বাজারে যাওয়া মানুষটি শেষ পর্যন্ত 15-16 হাজার টাকার ফোন কিনে বাড়ি ফেরে। এটি তাদের একটি সুপরিকল্পিত মার্কেটিং স্ট্র্যাটেজি ছাড়া আর কিছুই নয়।
সফটওয়্যার আপডেট নিয়েও চলে এক অদ্ভুত লুকোচুরি। এখন প্রায় সব কোম্পানিই প্রতিশ্রুতি দেয় যে তারা তিন বছর বা সাত বছর পর্যন্ত আপডেট দেবে। শুনতে খুব ভালো লাগলেও বাস্তবে দেখা যায়, এই আপডেটগুলো আসতে অনেক সময় অস্বাভাবিক দেরি হয়। আবার আপডেট দেওয়ার পর দেখা যায় ফোনের পারফরম্যান্স আগের চেয়ে কমে গেছে বা ব্যাটারি দ্রুত শেষ হচ্ছে। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে আপডেট আসার পর দামী ফোনেও নানা প্রযুক্তিগত সমস্যা বা 'গ্রিন লাইন' ইস্যু দেখা দিচ্ছে। কোম্পানিগুলো যখন আপডেট দেওয়ার কথা বলে, তখন তারা নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা মেনে চলে না। অনেক ব্র্যান্ড তো আবার নতুন ফোন বাজারে আসার কয়েক মাস পরেই পুরনো মডেলের দিকে আর ফিরেও তাকায় না। আপডেট মানে যদি ফোন ধীরগতি হয়ে যাওয়া হয়, তবে সেই আপডেটের প্রতিশ্রুতি আসলে গ্রাহককে বোকা বানানো ছাড়া আর কিছুই নয়।
বাজেট এবং মিড-রেঞ্জ ফোনের ক্ষেত্রে ব্লোটওয়্যার বা আগে থেকে ইন্সটল করা অ্যাপগুলো একটি বড় মাথাব্যথার কারণ। আপনি লক্ষ্য করলে দেখবেন, অনেক দামী ব্র্যান্ডের ফোনেও এমন সব অ্যাপ থাকে যা আপনার কোনো কাজেই আসে না। এই অ্যাপগুলো ফোনের স্টোরেজ নষ্ট করে এবং সারাক্ষণ আপনার ডেটা ব্যবহার করে আপনাকে বিজ্ঞাপন দেখাতে থাকে। অনেক ক্ষেত্রে এই অ্যাপগুলোর বিজ্ঞাপন এতই আপত্তিকর হয় যে পরিবারের সামনে ফোন ব্যবহার করা অস্বস্তিকর হয়ে পড়ে। মজার বিষয় হলো, কোম্পানিগুলো এই থার্ড-পারিটি অ্যাপগুলো থেকে মোটা অঙ্কের টাকা পায়। আপনি যখন পুরো টাকা দিয়ে একটি ফোন কিনছেন, তখন সেই ফোনের ওপর আপনার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ থাকা উচিত। কিন্তু কোম্পানিগুলো নিজের লাভের জন্য আপনার গোপনীয়তা এবং বিরক্তির তোয়াক্কা না করেই ফোনের মধ্যে আবর্জনা ভরে দিচ্ছে।
বর্তমানে স্মার্টফোন বাজারে সবচেয়ে বড় 'বাজওয়ার্ড' হলো এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। আজকাল 5-7 হাজার টাকার ফোনেও 'AI Plus' বা 'AI Camera' লিখে দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু একটু খোঁজ নিলে দেখা যাবে, সেই ফোনে এআই চালানোর মতো প্রয়োজনীয় হার্ডওয়্যার বা প্রসেসরই নেই। গুগলের মতো কোম্পানিগুলো যেখানে এআই দিয়ে দারুণ কিছু কাজ করছে, সেখানে সাধারণ ব্র্যান্ডগুলো শুধু নামের সাথে এআই জুড়ে দিয়ে দাম বাড়ানোর চেষ্টা করছে। এটা অনেকটা এমন যে, প্যাকেট সুন্দর করে সাজিয়ে ভেতরে সস্তা জিনিস ভরে দেওয়া হয়েছে। সাধারণ মানুষ যখন শোনে ফোনে এআই আছে, তখন তারা ভাবে হয়তো দারুণ কিছু হবে। কিন্তু ব্যবহারের সময় দেখা যায় তা সেই পুরনো সাধারণ ক্যামেরার মতোই কাজ করছে। এই ধরণের মিথ্যে বিপণন কৌশল গ্রাহকদের বিশ্বাসের অমর্যাদা করছে।
ক্যামেরা মডিউল নিয়ে যে কারসাজি চলে তা শুনলে আপনি হেসেই ফেলবেন। অনেক সময় দেখা যায় ফোনের পেছনে চার-পাঁচটি ক্যামেরা লেন্সের মতো ডিজাইন করা হয়েছে। কিন্তু আপনি যদি ফোনটি খুলে দেখেন বা ভালো করে পরীক্ষা করেন, তবে দেখবেন সেখানে মাত্র একটি বা দুটি ক্যামেরা সত্যি কাজ করছে। বাকিগুলো হয় স্রেফ প্লাস্টিকের ডিজাইন, নয়তো কোনো কাজের না এমন ছোট ডেপথ সেন্সর বা ম্যাক্রো লেন্স। কোম্পানিগুলো এমনভাবে ডিজাইন করে যাতে দূর থেকে মনে হয় ফোনটি খুব প্রিমিয়াম এবং এতে অনেকগুলো ক্যামেরা আছে। এমনকি অনেক সময় ফ্ল্যাশলাইটকেও এমনভাবে বসানো হয় যেন সেটা একটা ক্যামেরা লেন্সের মতো দেখায়। বেশি মেগাপিক্সেলের সংখ্যা দিয়েও মানুষকে বিভ্রান্ত করা হচ্ছে। ২০০ মেগাপিক্সেল শুনে আমরা অবাক হই, কিন্তু দিনশেষে সেই ক্যামেরার সেন্সর যদি ভালো না হয়, তবে মেগাপিক্সেল দিয়ে ছবির মান ভালো হয় না।
সবচেয়ে বিরক্তিকর বিষয়টি হলো একই পুরনো মাল নতুন করে বাজারে আনা। অনেক সময় দেখা যায় গত বছরের একটি মডেল যা বাজারে খুব একটা ভালো চলেনি, কোম্পানি সেটির পেছনের রঙ বদলে দিয়ে বা ডিজাইন সামান্য পরিবর্তন করে নতুন নামে লঞ্চ করে দিচ্ছে। হার্ডওয়্যার, প্রসেসর বা ক্যামেরা—সবই আগের বছরের মতো থাকলেও বিজ্ঞাপন এমনভাবে দেওয়া হয় যেন এটা একদম লেটেস্ট প্রযুক্তি। যখন একজন সাধারণ মানুষ দোকানে যান, দোকানদার তাকে বলে এটা তো মাত্র দুই সপ্তাহ আগে লঞ্চ হয়েছে, এটাই সবথেকে নতুন। গ্রাহকও বিশ্বাস করে সেটা কেনেন এবং বেশি দাম দিয়ে আসেন। কিন্তু তিনি জানতেই পারেন না যে একই স্পেসিফিকেশনের ফোন এক বছর আগেও কম দামে পাওয়া যাচ্ছিল। এই রিব্র্যান্ডিংয়ের খেলা এখন স্মার্টফোন জগতে মহামারীর মতো ছড়িয়ে পড়েছে।
এখন প্রশ্ন হলো, আমরা কি তাহলে নতুন ফোন কিনব না? অবশ্যই কিনব, কিন্তু কেনার আগে আমাদের চোখ-কান খোলা রাখতে হবে। শুধু বিজ্ঞাপনের চাকচিক্য বা সেলিব্রিটিদের কথা শুনে ফোন কেনা বন্ধ করতে হবে। ফোনের স্পেসিফিকেশন ভালো করে যাচাই করা, বিশ্বস্ত রিভিউ দেখা এবং নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়া খুব জরুরি। কোম্পানিগুলো সবসময় চাইবে আপনার ইমোশন নিয়ে খেলে আপনাকে দিয়ে দামী পণ্য কেনাতে। কিন্তু একজন সচেতন গ্রাহক হিসেবে আপনার উচিত হবে তাদের এই ফাঁদে পা না দেওয়া। বড় বড় ব্র্যান্ডগুলোর কাজই হলো ব্যবসার বিস্তার ঘটানো, কিন্তু আপনার কষ্টের উপার্জনের টাকা কোথায় খরচ করবেন, সেই দায়িত্ব আপনারই। ফোনের গ্ল্যামার দেখে বিভ্রান্ত না হয়ে তার ভেতরের সত্যিকারের প্রযুক্তিটুকু বুঝুন, তবেই আপনি এই বিশাল প্রতারণার হাত থেকে বাঁচতে পারবেন।
ট্যাগস: স্মার্টফোন টিপস, স্মার্টফোন স্ক্যাম, টেকনিক্যাল গুরুজি, গ্যাজেট রিভিউ, স্মার্টফোন আপডেট, নতুন ফোন কেনার টিপস, এআই স্মার্টফোন, ক্যামেরা টেকনোলজি, স্মার্টফোন প্রাইসিং, বাংলা টেক নিউজ।
